দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে জর্জরিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সংঘাতনির্ভর ও মুখোমুখি অবস্থানের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে অংশ গ্রহণ মূলক, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার যে আভাস মিলছে, তা গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। চরম অস্থিরতার মধ্যেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে ‘সু-বাতাস’ বইতে শুরু করেছে, তা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে নতুন দিশা দেখাতে পারে। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের দৃশ্যমান রূপান্তর শুরু হয়েছে। দলীয় পুনর্গঠন, সাংগঠনিক সক্রিয়তা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে বিএনপি আবারও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে এনসিপির সংশ্লিষ্টতা ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের আলোচনা দেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দল ও ব্যক্তি নিজ নিজ অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন—যা রাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে ভিন্নমাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব ঘটনাপ্রবাহ মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের পুনর্বিন্যাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচনকেন্দ্রিক আস্থাহীনতা, বিরোধী দল দমনের অভিযোগ, একতরফা নির্বাচন এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে। ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর। তবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে, তা ভিন্ন বাস্তবতার বার্তা দিচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি, নির্বাচনী মাঠ গোছানোর প্রস্তুতি, সংলাপ ও সমঝোতার আলোচনা এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ গঠনের দাবি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিতে এক ধরনের ইতিবাচক গতি লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজপথের উত্তেজনা ও সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে এসে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সমস্যার সমাধানে ফেরার প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য নিঃসন্দেহে শুভ লক্ষণ। বিশেষ করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি এখন আর শুধু বিরোধী দলগুলোর বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, বুদ্ধিজীবী মহল এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উঠে এসেছে—এই নির্বাচন হতে হবে সম্পূর্ণ সংঘাতমুক্ত ও প্রাণহানিমুক্ত। কারণ অতীতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবং তার আগে-পরে সংঘর্ষে বহু তরতাজা প্রাণ ঝরে গেছে। সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের নির্বাচনে যেন একটি মানুষও প্রাণ হারায় না—এটাই জাতির প্রত্যাশা। এই লক্ষ্য পূরণে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কঠোর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যে দল বা ব্যক্তি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করবে, তার বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণ জনগণ যেন কোনো ভয় বা বাধা ছাড়াই নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে—সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।
গণতন্ত্র কেবল ভোট আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার সমন্বয়েই এর পূর্ণতা। সাম্প্রতিক সময়ে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যে আলোচনা ও বক্তব্য সামনে আসছে, তা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে দায়িত্বশীল আচরণের ইঙ্গিত দেয়। বিরোধী মতকে শত্রু নয়, বরং গণতান্ত্রিক অংশীদার হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে উঠলে রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো—এই সু-বাতাস এখনো পুরোপুরি স্থায়ী রূপ পায়নি। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে সময় লাগবে। প্রয়োজন হবে আন্তরিকতা, ধারাবাহিকতা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকলে জনগণের প্রত্যাশা আবারও হতাশায় পরিণত হতে পারে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত লাভের হিসাব না করে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
চরম অস্থিরতার রাজনীতিতে যে আশার আলো দেখা দিচ্ছে, তা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দায়িত্বশীল রাজনীতি, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং জনগণের সক্রিয় ও নির্ভীক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আবারও একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও টেকসই গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসতে পারে। এই সু-বাতাস যেন ক্ষণিকের ঝড় না হয়ে স্থায়ী পরিবর্তনের হাওয়ায় রূপ নেয়—এটাই আজ জাতির প্রত্যাশা।
লেখক ও গবেষক :
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি : ঢাকা প্রেস ক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেসক্লাব